আমি তোমারই আছি কলমে- বিশ্বরঞ্জন চক্রবর্তী

 



অবিনাশদা আপনার যখন সময় হবে, সপ্তাহে একদিন ক’রে বাবাকে দেখে যাবেন।

অবিনাশ মমতার বান্ধবী সুচিত্রার দাদা। অবিনাশও মমতাকে খুব পছন্দ করে। তাই সে বলে, রবিবার তার অফ্ থাকে, সেদিন গিয়ে দেখে আসবে। তবে ফিস দিলে সে যাবে না।
মমতার বাবা, বিপিনের বাইপাস হয়েছে। বাড়ি ফিরে বিপিন সুস্থ হয়ে ওঠে। মমতা অফিস যাওয়ার সময় বাবাকে প্রণাম করে। এটা তার বরাবরের অভ্যাস।
মমতাকে আশীর্বাদ ক’রে, বিপিন মনে মনে খুব লজ্জিত হয়। সেদিনের কথা মনে পড়ে – মমতা, দ্বিতীয় মেয়ে-সন্তান হিসেবে আসে। বিপিনের মুখে বেরিয়ে আসে, ‘আবার মেয়ে!’ সেদিন বিপিনের কথাটা শুনে বিপিনের স্ত্রীও খুব মর্মাহত হয়।
দুবছর পরে স্বামী স্ত্রী, দুজনেই খুব আনন্দিত হয় যখন তাদের একমাত্র পুত্র সন্তান, অমর আসে। অমরের বেশ ঘটা করে অন্নপ্রাশন হয়।
যদিও দুই মেয়ে, মনি ও মমতার ওটা নমঃ নমঃ করে হয়েছে। প্রতি বছর অমরের ধুমধাম করে জন্মদিন পালন হয়। মনি ও মমতা এটা মেনে নেয়- তারা যে ভাইকে খুব ভালোবাসে।
ইতিমধ্যে মনির ভালো ঘরে বিয়ে হয়। বিপিনের স্ত্রী, মানে মমতার মা , মনির বিয়ের বছর মারা যায়। তারপর বাবা ও ভাইকে নিয়ে মমতার সংসার।
মমতার বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে, কিন্তু সে রাজী হয় না। তার এক কথা- ভাইয়ের পড়া শেষ হোক, তারপর।
ভাই অমর আহমেদাবাদে ম্যানেজমেন্ট পড়ে। অমর যখন আই আই টি-র সেকেন্ড ইয়ারে, তখন বিপিন চাকরি থেকে অবসর নেয়। তারপর থেকে অমরের পড়াশোনার খরচ মমতা ই চালায়। অমরেরও যতো আবদার ছোড়দির কাছে।
ডক্টর অবিনাশ রবিবার ছাড়া অন্যান্য দিনেও আসে- বিপিনের চেক আপ করার অছিলায়। ধীরে ধীরে, তার ও মমতার সম্বন্ধ অনেক ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
অমর ম্যানেজমেন্ট পাশ ক’রে চাকরি পায়, একদম কোলকাতাতেই পোস্টিং। মমতা এবার নিশ্চিন্ত। এবার সে নিজের বিয়ে নিয়ে ভাববে।
এখন অবিনাশকে আর ‘না’ করা যাবেনা। বাবাকে সে ইঙ্গিত দেয়, অবিনাশের সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ করতে। বিপিন জানে, তার মেয়ে ও অবিনাশ পরস্পর দুজনকে ভালোবাসে।
অমর চাকরি পেয়েছে ঠিক, কিন্তু কেমন একটা ছাড়া- ছাড়া ভাব। ঠিকমতো বাবার খোঁজ নেয় না। মমতা আলাদা ভাবে অমরের সঙ্গে কথা ব’লে জানতে পারে যে, সে বিয়ে করেছে, ম্যানেজমেন্ট পড়ার সময়।
বাবা আঘাত পায়, এই ভয়ে বাবাকে সে ভাইয়ের বিয়ের ব্যাপারে কিছু বলতে পারেনা।
মমতা ভাইকে, তার ও অবিনাশের বিয়ের কথা আর বলে না। সে বুঝতে পারে ভাই বাবার দায়িত্ব নেবে না।
মমতা যখনই বাবার কথা অবিনাশকে বলেছে, অবিনাশ তাকে আশ্বস্ত করে যে বিয়ের পর তারা দুজন মিলে বাবাকে দেখবে।
কিন্তু মমতা মনে করে, সেটা বিয়ের পর স্থায়ী নাও হ’তে পারে। বিয়ের আগে ভাবাবেগের আশ্বাস, আর বিয়ের পর বাস্তব এক হয় না।
কাউকে কিছু না ব’লে, মমতা তার বাবাকে মানা ক’রে দেয় -তার বিয়ের সম্বন্ধে কথা ব’লতে। অবিনাশের সঙ্গেও সে দূরত্ব রেখে চলে।
অনেক অনুরোধ করেও অবিনাশ এর কারণ উদঘাটন করতে পারে না।
বছর দুই পরে, বুকে অস্বস্তি নিয়ে বিপিন হাসপাতালে ভর্তি হয়। খবর পেয়ে অবিনাশও সেখানে আসে। তিন দিন আই. সি. ইউ, তে থেকে, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সে।
অবিনাশ মমতার বাবার সব কাগজপত্র বুঝিয়ে দিয়ে চলে যায়না। সারাক্ষণ তার সাথে থাকে। অন্তেষ্টিক্রিয়া সমাপ্ত হ’লে, পরে সে বাড়ি যায়।
রাত্রে ঘুমাতে যাওয়ার আগে মমতা ফোনটা খুলে দেখে অবিনাশের একটি টেক্সট বার্তা, ‘আশা করি তুমি বাবার শোক ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠবে। তোমার অবিনাশ – এখনো তোমার অপেক্ষায় আছে, উত্তরের আশায় রইলাম’।
মমতা আর দেরি করে না, ‘ অবিনাশ, আমি তোমারই আছি’।

Post a Comment

0 Comments