কবিতার মূল্য - প্রকাশ চন্দ্র রায়

 



কবি’র রচিত কবিতার পাণ্ডুলিপি,খসড়াখাতা,নোটবুক,ডায়েরী সবকিছু পুড়ে ফেলেছে কবিপত্নী। তার আক্ষেপ এই যে, কবি কোনপ্রকার আয়-উপার্জনের ব্যবস্থা না করে দিনরাত কেবল কবিতা লেখা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। এদিকে সংসারের বেহাল দশা। চাল নেই,ডাল নেই,ছেলেমেয়েরা প্রায়ই অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে।

কবিপত্নীর গালাগাল আর কটুক্তি সহ্য করতে না পেরে,
রাগ করে নিরুদ্দেশের পথে যাত্রা করলেন অভিমানি কবি।
হেঁটে যেতে যেতে আলপথে সামনে দেখলেন বিরাটাকৃতির এক ষাঁড়, মাথাটা নিচু করে,গুঁতো মারার ভঙ্গিতে শিঙদুটো উঁচিয়ে সামনের এক পায়ের ক্ষুর দিয়ে মাটি আঁচড়াতে আঁচড়াতে খুব ঘন ঘন পিচকারিবেগে মূত্রত্যাগ করছে। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব কবির মনে হঠাৎ করে একটি কবিতার চিত্রকল্প জেগে উঠলো। তৎক্ষণাত খাতা কলম বের করে লিখে ফেললেন কবিতা–
“ক্ষুর ঘষছিস-ক্ষুর ঘষছিস,
আর ছিটাচ্ছিস পানি;
এরপরে যে কী কাণ্ড করবি
তা-তো আমি জানি”।
লেখাটা লিখে ফেলে আহল্লাদে আটখানা কবি,ক্রদ্ধ ষাঁড়টার পাশকেটে ছুটে চললেন দেশের রাজপ্রাসাদ অভিমুখে-রাজা’র কাছে কবিতাটা বিক্রি করতে হবে।
রাজপ্রাসাদে পৌঁছে রাজাকে বললেন,
-মহারাজ,আপনার জন্য মহাপোকারী একটা কবিতা লিখে এনেছি। আপনি এটা কিনে নেন।
কবিতা পড়ে রাজা কিছুই বুঝলেন না,তবুও একজন গরীব কবির মানরক্ষার্থে বললেন,
-আচ্ছা,কতটাকা দিতে হবে এ কবিতার দাম?
আত্মগর্বে গর্বিত কবি বললেন,
-মাত্র একলক্ষ টাকা দিবেন মহারাজ।
দাম শুনে চমকে উঠলেন মহারাজ! তবুও সাহিত্যানুরাগী ও প্রজাবৎসল রাজা কবিকে একলক্ষ টাকা দিয়ে বললেন,
-আচ্ছা বিশেষ কী উপকার হবে এ কবিতা দিয়ে?
অত্যন্ত গম্ভীর ভাব নিয়ে কবি বললেন,
-বিশেষ কী উপকার হবে,তা এক্ষণে বলা যাচ্ছে না মহারাজ, তবে এটা মুখস্ত করে মাঝে মাঝে আবৃত্তি করবেন,দেখবেন এর সুফল একদিন পাবেন-ই।
টাকা পেয়ে মহানন্দে ফিরে চললেন কবি গৃহাভিমুখে।
গৃহে ফিরে প্রিয় পত্নীকে টাকাগুলো দিতে দিতে বললেন,
– এই দেখো,একলক্ষ টাকা পেলাম মাত্র একটা কবিতার দাম,আর তুমি হাজার হাজার কবিতা পুড়ে ফেলেছো আমার।
অনুশোনায় অনুতপ্ত কবিপত্নী স্বামীর দু’পা ধরে ক্ষমা চেয়ে নিলেন এবং বললেন,
-জীবনে আর কক্ষণোই কবিতা লিখতে বাঁধাপ্রদান করবো না।
মনে মনে ভাবলেন,একটা কবিতার মূল্য যদি লক্ষ টাকা হয়,তবে যতগুলো কবিতা পুড়িয়ে ফেলেছি,সেগুলোর মূল্য কতটাকা হতো!
প্রায় মাসখানেক পরে,একদিন নাপিত এসেছে রাজামশায়ের ক্ষৌরকার্য করতে,রাজামহাশয় চেয়ারে বসেছেন, নাপিত বারবার রাজার দাড়িগোঁফে জল ছিটাচ্ছে আর বারবার চামড়ার চামটি’তে ক্ষুরখানা ঘষে ঘষে শান দিচ্ছে কিন্তু ক্ষৌরকার্য শুরুই করছে না।
ক্ষৌরকার্যে দেরী হচ্ছে দেখে রাজা ভাবলেন, এরই ফাঁকে কবিতাটা একটু আবৃত্তি করে নিই। স্বল্প উচ্চস্বরে শুরু করলেন আবৃত্তি-
ক্ষুর ঘসছিস-ক্ষুর ঘসছিস
আর ছিটাচ্ছিস পানি,
এরপরে যে কী কাণ্ড করবি
তা-তো জানি আমি।
রাজার কণ্ঠে এরূপ আবৃত্তি শুনে নাপিতের আক্কেল-গুড়ুম! ক্ষুর-কাঁচি-চামটি ওখানে ফেলেই পালাতে লাগলো সে। দৌড়-দৌড়-দৌড়,,,
নাপিতের এরূপ অস্বাভাবিক কান্ড দেখে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে পাইক-পেয়াদাদের আদেশ করলেন মহারাজ,
-যাও বন্দি করে আনো ব্যাটা নাপিতকে।
আদেশ পেয়ে ছুটলো পেয়াদা-পাইক,সৈন্য-সামন্ত।
কিছুক্ষন পরেই বিচার বসলো। নাপিতকে জিজ্ঞেস করলেন রাজা মহাশয়,
-বল ব্যাটা,কেন পালাচ্ছিলি ক্ষৌরকার্য ছেড়ে?
ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নাপিত বলল,
-মহারাজ,আপনি আমার দুরভিপ্রায় বুঝে ফেলেছেন বলে,প্রাণভয়ে পালাচ্ছিলাম।
নাপিতের কথার মাথামুণ্ড কিছুই বুঝলেন না রাজামহাশয় ও রাজসভার সভাসদবৃন্দ!
দ্বিগুণ রাগে রাগান্বিত রাজা আবার বললেন,
-কী বলতে চাস? পরিস্কার করে বল ব্যাটা!
এবার স্পষ্ট করে বিস্তারিতভাবে বলতে শুরু করলো ভয়ার্ত নাপিত,
-মহারাজ,আপনার একমাত্র ছেলে, আমাকে লোভ দেখিয়েছেন যে,ক্ষৌরকার্য চলাকালীন যদি আমি ক্ষুর দিয়ে আপনার গলাটা কেটে দেই তাহলে আপনি মারা যাবেন আর আপনার ছেলে রাজা হয়ে আমাকে মহামন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত করবেন। পদের লোভে রাজী হয়ে আজকে আমি তাই-ই করতে যাচ্ছিলাম,কিন্তু আপনি কবিতার ছন্দে বললেন যে-
ক্ষুর ঘসছিস-ক্ষুর ঘুর ঘসছিস
আর ছিটাচ্ছিস পানি—
এর পরের চরণটা আর বলতে হলো না!
বিচারকার্য স্থগিত করে,রাজা আদেশ করলেন,
-যান মহামন্ত্রী মহাশয়,এক্ষুণি গিয়ে সেই মহামান্য কবিকে সসম্মানে নিয়ে আসুন। আমি তাকে সভাকবি পদে অধিষ্ঠিত করবো।( সমাপ্ত) ২৩,০৭,২০২১ শুক্রবার।

Post a Comment

0 Comments